নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা | ১৭ মে, ২০২৬
খুলনা: খুলনায় উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের সরলতাকে পুঁজি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া এক আন্তর্জাতিক ভিসা প্রতারক চক্রের সন্ধান মিলেছে। চক্রের মূল হোতা এক দম্পতি ভুয়া ভিসা ও জাল বিমান টিকিট দিয়ে দৌলতপুরের এক ভুক্তভোগী পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ২৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে। পুলিশি খাঁচায় বন্দি হওয়ার পর আদালতে মুচলেকা দিয়ে পার পেলেও, গত ৬ মাস ধরে আইন ও আদালতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পলাতক রয়েছে এই চতুর দম্পতি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই ভয়ঙ্কর প্রতারক সিন্ডিকেটের মূল চালিকাশক্তি মাহমুদা আক্তার ও তার স্বামী নাঈম আহমেদ।
যেভাবে পাতা হলো প্রতারণার ফাঁদ
ঘটনার বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে খুলনা মহানগরীর দৌলতপুর থানাধীন পূর্বসেনপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো: ফারুক হোসেনের ছেলে মো: আব্দুল্লাহর পরিবারের ওপর নজর পড়ে এই চক্রের। ইউরোপ বা উন্নত দেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে তাদের আশ্বস্ত করা হয়। চক্রটির সুকৌশলী কথায় বিশ্বাস করে সরল মনে আব্দুল্লাহর পরিবার দীর্ঘ ৩ বছর ধরে বিভিন্ন দফায় নগদ এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে প্রায় ২৫ লক্ষাধিক টাকা তাদের হাতে তুলে দেয়।
টাকা নেওয়ার পর থেকেই শুরু হয় কালক্ষেপণ। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শেষ পর্যায়ে মাহমুদা ও নাঈম আহমেদ ভুক্তভোগী আব্দুল্লাহর হাতে একটি ভিসা এবং বিমান টিকিট হস্তান্তর করে। কিন্তু বিদেশ যাত্রার প্রাক্কালে টিকিট ও ভিসা যাচাই করতে গিয়ে আকাশ ভেঙে পড়ে আব্দুল্লাহর মাথায়। পরীক্ষা করে দেখা যায়, তাকে দেওয়া প্রতিটি নথিপত্রই সম্পূর্ণ জাল ও ভুয়া (Fake)।
পুলিশের অ্যাকশন ও আসামিদের চতুরতা
প্রতারণার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে গত ১০ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে খুলনার খানজাহান আলী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন ভুক্তভোগী আব্দুল্লাহ। অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে থানা পুলিশ তাৎক্ষণিক অভিযানে নামে এবং ১২ অক্টোবর ২০২৫ গভীর রাতে আসামি মাহমুদা আক্তার ও নাঈম আহমেদকে আটক করতে সক্ষম হয়।
পরবর্তীতে ১৪ অক্টোবর আসামিদের আদালতে সোপর্দ করা হলে, চতুর আসামিরা আইনি শাস্তি এড়াতে আদালতের ভেতরেই একটি আপোষনামা চুক্তি সম্পাদন করে। চুক্তি অনুযায়ী তারা তাৎক্ষণিকভাবে ৮ লক্ষ টাকা ফেরত দেয় এবং বাকি টাকা তদন্ত রিপোর্টের সাপেক্ষে পরবর্তী ১০ দিনের মধ্যে পরিশোধের মুচলেকা দিয়ে জামিন বা সাময়িক রেহাই পায়।
৬ মাস ধরে উধাও, নেপথ্যে পুরনো রেকর্ড
থানার ফাইনাল রিপোর্ট গত ১১ মে আদালতে দাখিল করা হলেও বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন থাকা অবস্থায় বিগত ৬ মাস ধরে সম্পূর্ণ পলাতক রয়েছে এই দম্পতি। তারা কোনো কোর্ট হাজিরায় উপস্থিত না হয়ে বিভিন্ন তালবাহানায় আত্মগোপন করে আছে।
স্থানীয় ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা গেছে, মাহমুদা-নাঈম দম্পতির এটাই প্রথম অপরাধ নয়। ইতিপূর্বেও বিভিন্ন জেলায় এই দম্পতির নামে একাধিক অর্থ আত্মসাৎ ও ভিসা প্রতারণার মামলা রয়েছে। এদের মূল ব্যবসাই হলো মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি
বর্তমানে ২৫ লাখ টাকা হারিয়ে এবং আসামিদের এমন চতুরতায় চরম আর্থিক ও মানসিক বিপর্যস্ততার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবারটি। এই আন্তর্জাতিক চক্রের পেছনের গডফাদারদের খুঁজে বের করতে এবং পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে খুলনার পুলিশ প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী পরিবার।