
পেয়ার আলী, ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি:
অভাব-অনটন আর অনিশ্চয়তাকে পেছনে ফেলে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন ঠাকুরগাঁওয়ের প্রান্তিক আদিবাসী নারীরা। প্রশিক্ষণ, পরামর্শ, ক্ষুদ্র ঋণ, সরকারি সেবার সঙ্গে সংযোগ ও আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বদলে যাচ্ছে তাঁদের জীবন। তাঁদেরই একজন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার নারগুন ইউনিয়নের কহরপাড়া গ্রামের আরতি মার্ডি।
একসময় আরতি মার্ডির সকাল শুরু হতো কাজের খোঁজে বের হওয়ার তাড়া দিয়ে। একদিন কাজে যেতে না পারলে সংসারে চুলোয় হাঁড়ি উঠত না। স্বামী ছিলেন দিনমজুর। নিজেদের কোনো ভিটেমাটি না থাকায় খাসজমিতে ছাপড়া ঘর তুলে বসবাস করতেন তাঁরা। এর মধ্যে সন্তানদের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ চালানো ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে সেই কঠিন পরিস্থিতি এখন অনেকটাই বদলে গেছে। বর্তমানে আরতি মার্ডির বাড়িতে রয়েছে তিনটি গাভী, পাঁচটি ছাগল, পাঁচটি হাঁস ও ১৫টি মুরগি। পাশাপাশি তিনি সবজি ও ধান চাষের সঙ্গে পারিবারিক পুষ্টিবাগানও করছেন। এসব কর্মকাণ্ড থেকে তাঁর মাসিক আয় প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। স্বামী-সন্তানসহ পরিবারের মোট মাসিক আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। বর্তমানে তাঁর গড়ে তোলা সম্পদের মূল্য প্রায় ১২ লাখ টাকা।
আরতির জীবনে পরিবর্তনের শুরু ২০১৯ সালের অক্টোবরে। ওই সময় ঠাকুরগাঁওয়ে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)-এর ‘পাথওয়েজ টু প্রসপারিটি ফর এক্সট্রিমলি পুওর পিপল (পিপিইপিপি)’ প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রকল্পের আওতায় তিনি ‘প্রসপারিটি বনফুল ইকো গ্রাম কমিটি’র সদস্য হন।
নিয়মিত সভায় অংশ নিয়ে আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড, সঞ্চয়, কৃষি ও পশুপালনসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ পান তিনি। করোনাকালে প্রকল্প থেকে আরতি ও তাঁর কমিউনিটির অন্য সদস্যদের ৯ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়। সংসারের প্রয়োজন মেটানোর পর অবশিষ্ট টাকা দিয়ে একটি ছাগল কেনেন তিনি। সেই ছোট বিনিয়োগই তাঁর ঘুরে দাঁড়ানোর পথ তৈরি করে।
পর্যায়ক্রমে প্রকল্পের কমিউনিটি মোবিলাইজেশনের মাধ্যমে সরকারি বিভিন্ন সেবার সঙ্গে যুক্ত হন আরতি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে তিনি একটি সরকারি ঘর পান। প্রাণিসম্পদ অফিস থেকেও গাভী পালনের জন্য অনুদান পান। তাঁর ছোট ছেলে ইএসডিও থেকে তিন মাসের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিয়ে বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন।
২০২৪ সালের আগস্টে উচ্চমূল্যের নিরাপদ সবজি চাষের জন্য প্রকল্প থেকে ১২ হাজার টাকা সহায়তা পান আরতি। ৫৫ শতাংশ জমিতে মিষ্টি কুমড়া চাষ করে সব খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ৬০ হাজার টাকা লাভ করেন। পরে ইএসডিও থেকে প্রথম দফায় ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে আরও ৫০ শতাংশ জমি বন্ধক নেন। সেখানে সবজির পাশাপাশি ধান চাষ শুরু করেন।
এভাবে সাত দফায় মোট ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে তা আয়বর্ধক কাজে বিনিয়োগ করে বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন আরতি। তাঁর এই সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে ইএসডিওর পক্ষ থেকে ‘শ্রেষ্ঠ নারী উদ্যোক্তা’ পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি।
আরতি মার্ডি বলেন, “একসময় আমাদের সংসারে খুব কষ্ট ছিল। একদিন কাজ না করলে চুলোয় হাঁড়ি উঠত না। ইএসডিওর সহায়তা ও পরামর্শ পাওয়ার পর ধীরে ধীরে গরু-ছাগল পালন, সবজি ও ধান চাষ শুরু করি। এখন নিজের কিছু সম্পদ হয়েছে। সংসারে স্বচ্ছলতা এসেছে। আগে প্রতিদিনের খাবারের চিন্তা করতে হতো, এখন সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারছি।”
একই ইউনিয়নের নালাডাঙ্গী আদিবাসী এলাকার শান্তি মার্ডির জীবনেও এসেছে পরিবর্তন। দিনমজুর স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে একসময় অভাব-অনটনের মধ্যে দিন কাটত তাঁর। ইএসডিওর পিপিইপিপি প্রকল্পের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিয়মিত সভায় অংশ নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ নেন তিনি।
বর্তমানে তাঁর বাড়িতে রয়েছে সাতটি গবাদিপশু। পরে প্রকল্পের কর্মীদের পরামর্শে শুরু করেন ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার উৎপাদন। এ কাজে ইএসডিও তাঁকে ৫০ হাজার টাকা অনুদান দেয়। সেই অর্থ দিয়ে ঘরসহ ছয়টি সেট নির্মাণ করে কেঁচো সার উৎপাদন শুরু করেন তিনি। বর্তমানে প্রতি কেজি ১৫ টাকা দরে কৃষকদের কাছে সার বিক্রি করে মাসে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করছেন শান্তি।
শান্তি মার্ডি বলেন, “একসময় স্বামীর সামান্য আয়ে সংসার চালাতে খুব কষ্ট হতো। ইএসডিওর পরামর্শ ও সহায়তায় ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি শুরু করি। এখন নিজের উৎপাদিত কেঁচো সার বিক্রি করে মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করছি। এই আয় সংসারের কাজে লাগছে, পাশাপাশি নিজেরও আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। এখন আরও ভালো কিছু করার স্বপ্ন দেখি।”
আরতি ও শান্তির মতো আদিবাসী পল্লির মিনতি সরেন, চিন্তামনি মুর্মু, জসপিনা মুর্মু, সখিনা সরেন ও সুমি হাসদার জীবনেও পরিবর্তন এসেছে। তাঁদের অনেকেই প্রশিক্ষণ ও সহায়তা নিয়ে কৃষি, পশুপালন ও অন্যান্য আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছেন।
ইএসডিও জানায়, ঠাকুরগাঁওয়ের পাঁচ উপজেলার মধ্যে তিনটি উপজেলা ও ১৬টি ইউনিয়নে বসবাসরত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, জীবনমান উন্নয়ন, নিজস্ব ভাষার চর্চা এবং আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
ইএসডিওর টেকনিক্যাল অফিসার মো. জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, শুধু আর্থিক সহায়তা দিয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমানের স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাঁদের দক্ষতা বৃদ্ধি, আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং সরকারি সেবার সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করাই তাঁদের মূল লক্ষ্য।
টেকনিক্যাল অফিসার (কমিউনিটি মোবিলাইজেশন) ও টিম লিডার মোছা. মোসলেমা খাতুন বলেন, “আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষকে শুধু সহায়তা দেওয়া নয়, তাঁদের নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা তৈরি করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। আরতি মার্ডি ও শান্তি মার্ডির মতো নারীদের পরিবর্তন আমাদের কাজের বড় একটি সাফল্য। তাঁদের দেখে অন্য নারীরাও উৎসাহিত হচ্ছেন।”
অভাবের সঙ্গে প্রতিদিনের লড়াই থেকে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর এই গল্পগুলো প্রমাণ করে—সঠিক সুযোগ, প্রশিক্ষণ, পুঁজি ও সহযোগিতা পেলে প্রান্তিক আদিবাসী নারীরাও নিজেদের ভাগ্য বদলে পরিবার ও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ওয়েবসাইট এর কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি
Leave a Reply