
এমডি রেজওয়ান আলী বুরো প্রধান:
দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার কাটলা ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর এলাকায় কথিত স্বর্ণের বিস্কুট উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জনমনে চরম কৌতূহল, উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে একদিকে পুলিশ প্রশাসনের “না জানার”অবস্থান,অন্য দিকে স্থানীয়দের একাধিক বক্তব্য সব মিলিয়ে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ঘটনাস্থলে মোট সাতটি স্বর্ণের বিস্কুট ছিল। তবে সেই বিস্কুটগুলো বর্তমানে কোথায় রয়েছে তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা প্রশ্ন। কেউ বলছেন,বিস্কুট পানিতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল,আবার কেউ বলছেন,সেগুলো পরে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এলাকাবাসীর প্রশ্ন
উদ্ধার হওয়া স্বর্ণ গেল কোথায়?”
অভিযোগ উঠেছে,বিরামপুর থানা পুলিশের কয়েকজন সদস্য গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঘটনাস্থলে অভিযান পরিচালনা করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি জানান,সীমান্ত দিয়ে স্বর্ণ পাচারের তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা রামচন্দ্রপুর গ্রামের স্বপন চন্দ্রের স্ত্রী শ্যামলী রানীর বাড়ির পাশের ডোবায় স্বর্ণের বিস্কুট ফেলে দেওয়ার নাটক তৈরি করেন। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে বলেও জানা যায়। পরে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করলে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে,কাটলা ইউনিয়নের দক্ষিণ দাউদপুর গ্রামের মিরাজ উদ্দিনের ছেলে জামিল ওরফে মিস্টারের নাম এ ঘটনায় উঠে আসে। গ্রাম পুলিশ মনছুর আলী দাবি করেন,জামিল তাকে জানিয়েছেন উক্ত স্বর্ণের প্রকৃত মালিক তিনি নন; বরং দক্ষিণ দাউদপুর সমতুল্যা পাড়ার মৃত নইমুদ্দিনের ছেলে জিল্লুর রহমান এবং উত্তর দাউদপুর বেপারীপাড়ার সাইফুল ইসলামের ছেলে সাহেব আলী এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে জিল্লুর রহমান ও সাহেব আলী কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ঘটনার পর স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশ পুলিশের দায়িত্ব যেখানে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা,সেখানে যদি কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে সরকারি সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে, তবে জনগণ কোথায় ন্যায়বিচার পাবে?
স্থানীয়দের আরও দাবি,থানার আওতাধীন কোনো অভিযান সাধারণত অফিসার ইনচার্জ (ওসি)-এর অনুমতি ছাড়া পরিচালিত হওয়ার কথা নয়। তাহলে উক্ত অভিযানের বিষয়ে বিরামপুর থানার ওসি সাইফুল ইসলাম সরকার অবগত ছিলেন কি না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে জনমনে। ঘটনা সূত্রে আরও জানা যায়,বিরামপুর থানার বেতার বার্তা অপারেটর রাশেদুজ্জামান ও হাকিমপুর থানার কনস্টেবল সাইফুল ইসলামের নাম বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। যদিও মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে রাশেদ মোবাইলে কল কেটে দেন, সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায় তাঁকে ইতোমধ্যেই ঢাকায় ক্লোজড করা হয়েছে বলে জানা যায়। এদিকে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে প্রকাশ “নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিরামপুর থানার এক পুলিশ সদস্য দাবি করেন,বিষয়টি ওসি সাইফুল ইসলাম সরকার জানতে পারার পর অভিযানে থাকা দুই পুলিশ সদস্য উদ্ধার হওয়া দুটি সোনার বার তাঁর কাছে জমা দেন। তবে অভিযোগ রয়েছে,এ বিষয়ে কোনো আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করে ওসি তিন দিনের ছুটিতে চলে যান। অন্যদিকে স্থানীয়দের দাবি, ঘটনাটিতে আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্য জড়িত থাকতে পারেন। এমনকি অভিযোগ রয়েছে ঘটনার পর উদ্ধার হওয়া স্বর্ণের বার যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় জব্দ না করে তা গোপন করার চেষ্টা হয়েছে। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্যমতে,ওসি সাইফুল ইসলাম সরকার বিষয়টি জানার পরও কোনো তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ না করে ছুটিতে চলে যান। এতে জনমনে নতুন করে রহস্য ও সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। বিরামপুর রেলস্টেশনে থানার গাড়ি রেখে দ্রুত ট্রেনে ওঠার ঘটনাও স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। এদিকে সহকারী পুলিশ সুপার (হাকিমপুর সার্কেল) আনম নিয়ামত উল্লাহ জানান,প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে দুই পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তে যার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও তিনি জানান।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা পুলিশ সদস্য উদ্ধারকৃত আলামত গোপন, আত্মসাৎ বা আইনি প্রক্রিয়া ব্যতীত সরিয়ে ফেলার সঙ্গে জড়িত থাকেন,তবে তা দণ্ডবিধি,দুর্নীতি দমন আইন এবং সরকারি কর্মচারী আচরণবিধির গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হতে পারে।
এলাকাবাসী সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ,পুলিশ সদর দপ্তর,রংপুর রেঞ্জ ডিআইজি এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ঘটনার নিরপেক্ষ,স্বচ্ছ ও সরেজমিন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ঘটনায় জড়িত সকল ব্যক্তি তারা যেই হোক না কেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি উঠেছে। বর্তমানে পুরো বিরামপুর জুড়ে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে
“স্বর্ণের বিস্কুটগুলো গেল কোথায়,আর কারা আড়াল করছে প্রকৃত ঘটনা?”
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ওয়েবসাইট এর কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি
Leave a Reply