সংবাদ শিরোনাম:
কুলিক নদীর তীরে নবজাতকের মরদেহ, কুকুরের মুখ থেকে উদ্ধার পীরগঞ্জে এমপিও জালিয়াতির অভিযোগ সহকারী শিক্ষকই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বিরামপুরে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালিত,প্রবীণদের সম্মানে বর্ণাঢ্য র‍্যালি ও আলোচনা সভা ‎বিরামপুরে “Smart Union” বাস্তবায়নে ইউপি চেয়ারম্যান ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ‎ এনজিওর কিস্তি আর দিনমজুর বাবার সংগ্রাম পেরিয়ে জজ হলেন গোমস্তাপুরের কাজল পাঁড়ে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ছয় প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ নিয়ামতপুরে কারাম উৎসব ২০২৬ অনুষ্ঠিত ফুলবাড়ী পল্লীতে ট্রান্সফরমা চোর কর্তৃক প্রতিপক্ষকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি ফুলবাড়ী (২৯) বিজিবি ৪৬ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী কেক কেটে পালিত হয় ফুলবাড়ীতে সড়ক পাকা করণসহ বিভিন্ন সমস্যা নিরসনের দাবি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের
এনজিওর কিস্তি আর দিনমজুর বাবার সংগ্রাম পেরিয়ে জজ হলেন গোমস্তাপুরের কাজল পাঁড়ে

এনজিওর কিস্তি আর দিনমজুর বাবার সংগ্রাম পেরিয়ে জজ হলেন গোমস্তাপুরের কাজল পাঁড়ে

লেখক: শান্ত পাহান, ঠাকুরগাঁও
অভাব-অনটন, এনজিওর ঋণের কিস্তি, দিনমজুরি আর সংসারের নিত্যদিনের টানাপোড়েন—সবকিছুকে পেছনে ফেলে স্বপ্ন পূরণ করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার মাধাইপুর গ্রামের তরুণ কাজল পাঁড়ে। ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি।
কাজল পাঁড়ের এই সাফল্যে শুধু তাঁর পরিবার নয়, আনন্দের বন্যা বইছে পুরো মাধাইপুর গ্রামে। স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি চাকরিজীবীশূন্য এই গ্রাম থেকে প্রথমবারের মতো একজন তরুণ বিচার বিভাগে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছেন—যা পুরো গ্রামের জন্য গর্বের বিষয়।
কাজল পাঁড়ে গোমস্তাপুর উপজেলার পার্বতীপুর ইউনিয়নের মাধাইপুর গ্রামের তুরি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভূমিহীন কৃষক নরেশ পাঁড়ে ও পঞ্চমী জেড়ি দম্পতির একমাত্র ছেলে। অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা কাজলের শৈশব ছিল নানা প্রতিকূলতায় ভরা। সংসারে নিত্যদিনের খাবার জোগাড় করাই যেখানে কঠিন ছিল, সেখানে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
অভাবের কারণে কাজলের তিন বোনের পড়াশোনাও প্রাথমিক পর্যায়েই থেমে যায়। পরে তাঁদের বিয়ে হয়ে যায়। তবে প্রতিকূলতা কাজলের স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। অনেক সময় না খেয়েও স্কুলে যেতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু পড়াশোনার প্রতি অদম্য আগ্রহ তাঁকে সামনে এগিয়ে নেয়।
মাধাইপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর মিশন স্কুল ও এনায়েতপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন কাজল। পরে রহনপুর ইউসুফ আলী কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রেও প্রথমবার প্রত্যাশিত সাফল্য না এলেও হাল ছাড়েননি তিনি। পরবর্তী সময়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান। শেষ পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষার পথচলা শুরু করেন।
ছেলের পড়াশোনার খরচ চালাতে গিয়ে বাবা নরেশ পাঁড়েকেও করতে হয়েছে কঠোর সংগ্রাম। কখনো দিনমজুরি, কখনো এনজিওর ঋণের কিস্তি পরিশোধের চিন্তা, আবার প্রয়োজনের সময় বাড়ির গরু বিক্রি—সবকিছুই করেছেন ছেলের পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়, সেই আশায়।
কাজের বিনিময়ে অর্থ (কাবিটা) কর্মসূচির আওতায় শ্রমিক হিসেবেও কাজ করেছেন নরেশ পাঁড়ে। নিজের কষ্টের কথা না ভেবে ছেলের ভবিষ্যতের জন্য দিনের পর দিন পরিশ্রম করেছেন তিনি। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় কাজল নিজেও টিউশনি করে নিজের খরচের একটি অংশ বহন করতেন।
দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত ১৮তম বিজেএস পরীক্ষায় সাফল্য পান কাজল। তাঁর এই অর্জন যেন পরিবারের দীর্ঘদিনের কষ্ট, সংগ্রাম ও ত্যাগের স্বীকৃতি।
ছেলের সাফল্যে আবেগাপ্লুত মা পঞ্চমী জেড়ি। তিনি বলেন, তাঁর ছেলে ছোটবেলা থেকেই অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করেছে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সে স্বপ্ন দেখেছে বড় হওয়ার। সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় তিনি অত্যন্ত আনন্দিত। ছেলের সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর গ্রামের মানুষ বাড়িতে এসে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন—এটিও তাঁর কাছে বড় আনন্দের বিষয়।
কাজলের বোন স্বপ্না পাঁড়ে বলেন, তাঁদের পরিবার ছিল অত্যন্ত দরিদ্র। সংসারে অভাব থাকায় তিন বোনের কারও পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি। ভাইকে পড়াশোনা করাতে পরিবারের সবাইকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। তাঁর ভাই সেই কষ্টকে শক্তিতে পরিণত করে আজ এই অবস্থানে পৌঁছেছেন।
বাবা নরেশ পাঁড়ের মুখেও ছেলের সাফল্যের কথা বলতে গিয়ে আবেগ ঝরে পড়ে। তিনি জানান, ছেলে যখন ফোন করে জজ হিসেবে চাকরির জন্য সুপারিশ পাওয়ার খবর দেয়, তখন আনন্দে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
নরেশ পাঁড়ে বলেন, তাঁদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে অভাবের মধ্যে জীবন কাটিয়েছে। মাটি ও মানুষের সঙ্গে পরিশ্রম করে সংসার চালিয়েছেন। এখন তাঁর একটাই আশা—ছেলে বিচারকের দায়িত্ব পেয়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াবে এবং সৎভাবে মানুষের কল্যাণে কাজ করবে।
কাজলের সাফল্যে আনন্দিত মাধাইপুরের বাসিন্দারাও। তাঁদের মতে, কঠিন আর্থিক পরিস্থিতির মধ্যেও কাজল যেভাবে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন, তা গ্রামের অন্য তরুণদের জন্যও অনুপ্রেরণার।
১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশ পাওয়ার পর কাজল পাঁড়ে বলেন, মাধাইপুর গ্রামের সন্তান হিসেবে প্রথম সরকারি চাকরিতে তাঁর এই অর্জন অত্যন্ত আনন্দের। এই সাফল্য শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এর সঙ্গে তাঁর পরিবার, গ্রাম এবং তুরি জনগোষ্ঠীর মানুষের আবেগ ও প্রত্যাশা জড়িয়ে আছে।
নিজের শিক্ষাজীবনের কঠিন সময়ের কথা স্মরণ করে কাজল বলেন, একপর্যায়ে পরিবারের আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। সেই সময়ে তাঁর বড় বোন গরু বিক্রি করে তাঁকে পড়াশোনার জন্য টাকা দিয়েছিলেন। জীবনের সেই কঠিন মুহূর্তটি তিনি আজও ভুলতে পারেননি।
কাজল মনে করেন, বিচার বিভাগে তাঁর উপস্থিতি সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তরুণদেরও শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তুলবে। কঠিন পরিস্থিতিতেও চেষ্টা, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাস ধরে রাখলে সাফল্য অর্জন সম্ভব—নিজের জীবন দিয়ে সেটিই প্রমাণ করতে চান তিনি।
কাজলের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. সাজ্জাদ আলী বলেন, দরিদ্র পরিবারের সন্তান হয়েও কাজল যে সাফল্য অর্জন করেছেন, এতে তাঁরা অত্যন্ত আনন্দিত। তাঁর ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সফলতা কামনা করেন তিনি।
কাজল পাঁড়ের এই সাফল্য এখন মাধাইপুর গ্রামের মানুষের কাছে শুধু একটি চাকরি পাওয়ার ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য, পারিবারিক সংগ্রাম এবং স্বপ্নকে জয় করার এক অনুপ্রেরণাদায়ী গল্প।

এই পোস্টটি আপনার সামাজিক মিডিয়াতে ভাগ করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ওয়েবসাইট এর কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি

Design & Development BY : ThemeNeed.com